সাবটাইটেলই সই, তবু যে ৫টি বাংলা সিনেমা দেখে নিতেই হবে

9:38 am 17 May, 2016


‘এ যে সুরেরই ভাষা, ছন্দেরই ভাষা, তালেরই ভাষা, আনন্দেরই ভাষা/ ভাষা এমন কথা বলে বোঝে রে সকলে।’ একটা ভালো সিনেমাও সেরকমই। যা দেশ–কাল–সময়ের গন্ডি টাপকে যায় অনায়াসে।

ভালো সিনেমা এমনই এক মাধ্যম যা ভাষা, আর্থ–সামাজিক বিভেদ এবং পরম্পরাকেও পেরিয়ে চলে যায় অনেক দূরে। ভারতীয় জনতা বলিউড ঘরাণার সিনেমা নিয়েই মেতে থাকে। কিন্তু বলিউড ঘরাণার বাইরেও কিছু ছবি হয়।

নিঃসন্দেহে। তার বাজেট হয়তো অল্প। কিন্তু অন্যান্য অনেক কিছুতেই এমন মুন্সিয়ানা থাকে যা অবধারিতভাবে দর্শকের নজর টানতে বাধ্য করে। এখন প্রায় সব আঞ্চলিক ও বিদেশি ছবিতেই সাবটাইটেল থাকে। বেশিরভাগ সিনেমাই অনুবাদ করে দেখানো হয়। ফলে দর্শক তার আসল রস থেকে বঞ্চিত হন। এখানে আমরা ৫টি বাংলা সিনেমা বেছে নিয়েছি, যেগুলি সাবটাইটেল থাকলেও অবশ্যই দেখা উচিত। যেমনঃ

1. অর্ন্তজলী যাত্রা

পরিচালক গৌতম ঘোষ। কমল কুমার মজুমদার–এর ‘মহাযাত্রা’ উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ। সিনেমাটি ‘সতী’ নামে এক ভন্ড ধর্মীয় শাস্ত্রাচার এবং তার চেয়েও ভয়ানক ‘কুলীন’ প্রথার বহুবিবাহের ওপর তৈরি। এটি ১৯ শতকের ক্ষয়ে যাওয়া বাংলা সমাজের এক জ্বলন্ত দলিল।

সিনেমার গল্পে রয়েছে একটি বাচ্চা কাজের মেয়ে। পরিবারের সম্মান রাখতে যাকে মৃত্যুশয্যায় শায়িত এক বৃদ্ধের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। তারপরেই মৃত্যু আসন্ন দেখে সেই বৃদ্ধ এবং মেয়েটিকে নদীর ধারে রেখে আসে পরিবারের লোকজনেরা।

বৃদ্ধ মারা গেলে তার সঙ্গে সহমরণে যাবে সেই মেয়েটি। শ্মশানে মড়া পোড়ায় ডোম। সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর মানুষ হলেও গোটা ঘটনাটা তাকে নাড়া দেয়। ভাবায়।

এরপরেই মোচড় আসে গল্পে। মেয়েটা সাহায্য পায় সেই ডোমের। তারপর চলে মানবিকতার লড়াই। সমাজের উচ্চ স্তরের মানুষের সঙ্গে নিম্ন স্তরের মানুষের। গোটা সিনেমার ছত্রে-ছত্রে আছে গল্প বলার কায়দা। সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিচালকের মিউজিক। যা সিনেমাটাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে।

সিনেমার প্রধাণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন শম্পা ঘোষ ও শত্রুঘ্ন সিনহা। দু’জনের অভিনয়ই জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক স্তরে প্রশংসিত হয়েছে।

2. আকালের সন্ধানে

ভারতের সিনেমা জগতের অন্যতম পরিচালক ও কালজয়ী সব সিনেমার পথিকৃত মৃণাল সেন–এর তৈরি আকালের সন্ধানে। যদি আপনি সিনেমা–প্রেমিক হন তবে এ ছবি আপনাকে দেখতেই হবে। ১৯৪৩–এর ম্যান–মেড দুর্ভিক্ষ এই সিনেমার মূল বিষয়বস্তু।

ছবির অভিনেতা–অভিনেত্রীদের অভিনয় তত্কালীন গ্রামীণ জীবনে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। ১৯৮০ সালের (সিনেমাটি তৈরি হয়) প্রেক্ষিতে। ১৯৪৩ সালের আকালের সময় ও একজন গ্রামীণ মেয়ের দৃৃষ্টিকোণ, এই দুই ডায়মেনশনে সিনেমাটি তৈরি। ছবির প্রধান চরিত্রে আছেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, স্মিতা পাটিল এবং শ্রীলা মজুমদারের মতো পোড়খাওয়া অভিনেতা অভিনেত্রীরা।

সিনেমাটি জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক স্তরের সমালোচকদের প্রশংসা কোড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে ঝুলিতে ভরেছে অসংখ্য পুরস্কার। এর মধ্যে সেরা ফিচার ফিল্ম বিভাগে পেয়েছে ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড এবং ৩১ তম বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্পেশাল জুরি প্রাইজ হিসেবে – সিলভার বেয়ার।


3. সব চরিত্র কাল্পনিক

অসাধারণ প্রতিভাবান, চলচ্চিত্রবোদ্ধা অভিনেতা ও পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় তৈরি সব চরিত্র কাল্পনিক। গল্পে উঠে এসেছে এক মেয়ের জীবনপথে হাঁটার কথা। তার বিয়ে হয় এক বিখ্যাত কবির সঙ্গে। কিন্তু দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি। অসুখি দাম্পত্য নিয়ে একই ছাদের তলায় তারা বাস করে দুই দ্বীপের মতো।

একটা সময় আসে মেয়েটা যখন আর এই সম্পর্ক টানতে পারে না। ভেঙে দিতে চায় বিয়ে। কিন্তু এর মধ্যে হঠাতই মৃত্যু হয় স্বামীর। এবং কী আশ্চর্য স্বামীর না থাকার সময়েই মেয়েটি অনুভব করে তাদের জীবনেও প্রেম ছিল। বিরহের সময় সেই প্রেম আরও বেশি করে অনুভূত হয় তার। নববধূর জোড়া হাতের চিহ্ন, রাজা নারায়ণ দেব–এর সুর জুড়ে পরিত্যক্ত রেললাইনের মূর্চ্ছনা এবং জয় গোস্বামীর হৃদয় নিংড়ানো কবিতা সিনেমাটিকে সম্পূর্ণ রূপ দিয়েছে। ভাবছেন একটি কবিতাকে কীভাবে সাবটাইটেলের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব?

ভয় পাবেন না। জয় গোস্বামীর কবিতাকে সম্মান জানাতে সুন্দর সাবটাইটেল তৈরি হয়েছে। অভিনেতাদের মধ্যে বিপাশা বসু, প্রসেনজিত চ্যাটার্জি, সোহাগ সেন ও যিশু সেনগুপ্তের অভিনয় বিশ্বের সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেছে।

4. যুক্তি তক্কো আর গপ্পো

মুক্তমনা স্বাধীনচেতা অসামান্য প্রতিভাবান পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের অন্যতম সেরা সিনেমা এই যুক্তি তক্কো আর গপ্পো। তাঁর অসংখ্য সিনেমার মধ্যে এই ছবি অন্যরকম, অন্য স্বাদের। যেখানে আমরা দেখি ঋত্বিক ঘটকের ভেতরের ঋত্বিক ঘটককে। সিনেমা নির্মাতা ও আই পি টি এ–র সদস্য হিসেবে তাঁর মনের দোলাচল, সংকটের ছবি ফুটে ওঠে এই সিনেমায়।

ছবিটি বাঙালির সামাজিক – রাজনৈতিক অবস্থানের কথা বলে। দেখায় রাজ্য এবং দেশ নিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি মনের বিভিন্ন কমপ্লেক্স। এটি সিনেমার থেকেও অনেক বেশি করে ঋত্বিক ঘটকের আত্মজীবনী। এবং ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বয়ং ঋত্বিক ঘটক। আপনি চলচ্চিত্র সম্পর্কে উতসাহী এবং চলচ্চিত্রের ছাত্র হলে তো কথাই নেই, এই ছবিটা আপনাকে দেখতেই হবে।

5. অভিযান

শেষ করা যাক বাংলা সিনেমার প্রবাদপ্রতিম পরিচালক সত্যজিত রায়–কে দিয়ে। বাংলা চলচ্চিত্রের অভিভাবকসম এই পরিচালকের তৈরি পথের পাঁচালি, কলকাতা ট্রিলজি, চারুলতা–র মতো সিনেমাগুলি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। বলা যায়, এই ছবিগুলিই প্রচারের সব আলো শুষে নিয়েছে। কিন্তু যদি আপনি বলেন সত্যজিত রায়ের কোন সিনেমাটি সাবটাইটেলে দেখা যায় তবে বলতে হয় সেটি হল — অভিযান।

প্রধান চরিত্রে ওয়াহিদা রেহমান ও সৌমিত্র চ্যাটার্জি। সিনেমাটি এক প্রবীণ ট্যাক্সি ড্রাইভার নরসিংহ–র জীবনের কিছু মুহূর্তের ওপর তৈরি। তার প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রাম, গুলাবিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া। সেই গুলাবি, যে গ্রামের অল্পবয়সী বিধবা এবং যাকে নরসিংহ–র মালিক রক্ষিতা করতে চেয়েছিল। পুরনো জরা–জীর্ণ গাড়িটা গোটা সিনেমা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

অন্যান্য বাংলা ছবির থেকে সত্যজিতের এই সিনেমার কাহিনী বিন্যাস, গল্প বলার কায়দা, প্রতীকের ব্যবহার সবকিছুতেই অন্যরকম হয়েও এটি একটি সুপারহিট সিনেমা। বলাবাহুল্য সত্যজিত রায়ের অন্যান্য সিনেমার মতো এই সিনেমাটিও বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

Discussions



TY News